পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ব্যবস্থা ( Panchayat system in West Bengal)

বাংলা রচনা

ভূমিকা

গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ, সমস্যাদির সমাধান ও কিছু কিছু প্রশাসনিক দায়দায়িত্ব পালন প্রভৃতি উদ্দেশ্যে বর্তমান পঞ্চায়েত রাজ্যের উদ্ভব।ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটিয়ে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত তা পৌঁছে দেওয়া পঞ্চায়েতে ব্যবস্থার মূলভূত লক্ষ্য। স্বশাসনের যে গণতান্ত্রিক বনিয়াদ তার সার্থক প্রয়োগ ও সিদ্ধি পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মধ্যেই সম্ভব। পশ্চিমবঙ্গের সফল পঞ্চায়েত ব্যবস্থা সে কথাই প্রমাণ করেছে, আর সেজন্যই সারা ভারতের প্রশংসা ও সাধুবাদ কুড়িয়েছে এ রাজ্যের মাত্র 10-12 বছরের পঞ্চায়েতি শাসন ।

পঞ্চায়েতের ইতিহাস

প্রাচীন ভারতের পঞ্চায়েত ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। কমপক্ষে 5 জন বা তার কিছু বেশি গ্রামীণ মানুষের প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত সমিতি গ্রামে সংঘটিত বিবাদ-বিসংবাদ, অপরাধ ইত্যাদির বিচার ও মীমাংসা করত, গ্রামবাসীর নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ রক্ষায় থাকত বদ্ধপরিকর। ইংরেজ শাসনে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার ধ্বংস ঘটে। স্বায়ত্তশাসনের নামে বিদেশী বেনিয়াপ্রভুরা জেলা বোর্ড, লোকাল বোর্ড ইউনিয়ন বোর্ড গঠনের মাধ্যমে যা দেন তা নিজেদের শাসন এর স্বপক্ষে কিছু কায়েমী স্বার্থপর মানুষের হাতে অনগ্রসর দরিদ্র শ্রেণীর লোকের উপর শোষণ ও অত্যাচারের ক্ষমতা। স্বাধীনতা লাভের পর প্রথম 10 বছর চলে ইংরেজ প্রদত্ত স্বায়ত্তশাসনের অনুবর্তন। ‘কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ গ্রামের অনগ্রসর গরিব মানুষদের আরো বেশি দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দিয়ে গ্রামীণ বিত্তবানদের করে আরও বিত্তশালী। মেহতা কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পাঁচের দশকের শেষ দিকে গ্রাম পঞ্চায়েত ,অঞ্চল পঞ্চায়েত, আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদ নিয়ে চার স্তর বিশিষ্ট পঞ্চায়েত আইন প্রণীত হয় এবং বিভিন্ন রাজ্যে তা চালু হতে থাকে ওই পঞ্চায়েত ব্যবস্থায়। কেবল একটি স্তরেই প্রত্যক্ষ নির্বাচন হতো অবশিষ্ট স্তর গুলিতে হত পরোক্ষ নির্বাচন।

পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ব্যবস্থা

১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে পঞ্চায়েত আইনের ব্যাপক সংশোধন অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে ত্রিস্তর বিশিষ্ট পঞ্চায়েত ব্যবস্থার স্বপক্ষে আইন তৈরি হয় এবং তা বাস্তবায়িত করার জন্য মেহতা কমিটির সুপারিশ অনুসারে রাজনৈতিক দল ভিত্তিক নির্বাচনের ডাক দেওয়া হয়। ত্রিস্তর পঞ্চায়েত হল গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি ও জেলা পরিষদ। প্রতিটি সংস্থায় গঠিত হয় প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে এবং প্রতি সংস্থার মেয়াদকাল চার বছর। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে একই দিনে ১৫ টি জেলা পরিষদ, ৩২৪ টি পঞ্চায়েত সমিতি ও ৩২৪১ টি গ্রাম পঞ্চায়েতের নির্বাচন সর্বপ্রথম সম্পন্ন হয়। তারপর যথারীতি চার বছর অন্তর ১৯৮৩ ও ১৯৮৮- তে নির্বাচনের দ্বারা পঞ্চায়েত ব্যবস্থার সুষ্ঠু বিন্যাস ও ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ পশ্চিমবঙ্গের স্বায়ত্তশাসনকে জনমুখী ও শক্ত বুনিয়াদের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৯৩- এ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পঞ্চায়েতের ত্রিস্তরেই এক-তৃতীয়াংশ বা ২৩ হাজার মহিলা প্রার্থী নির্বাচিত হন। এই নির্বাচন পর্বে প্রতি স্তরেই তপশিলি জাতি ও উপজাতির জন্য আসন সংরক্ষিত হয়।

ভোটাধিকার প্রয়োগ

সাধারণ নির্বাচনের ভোটাধিকারের ভিত্তিতেই নির্বাচকমণ্ডলী পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। নবম লোকসভা নির্বাচনের সময় ভোটদাতাদের সর্বনিম্ন বয়স ২১ থেকে কমিয়ে ১৮ তে আনা হয়। ১৮ ও তদুধ্ব বয়সের তরুণ-তরুণীরাও পঞ্চায়েত নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। তৃণমূল স্তর পর্যন্ত গণতন্ত্রের একটি সার্থক ব্যবহার নিঃসন্দেহে এক প্রশংসা কর্ম প্রয়াস।

পঞ্চায়েতের কাজ ও দায়-দায়িত্ব

গ্রাম উন্নয়নে পঞ্চায়েতের ভূমিকা প্রশ্নাতীত। কৃষি ,শিক্ষা ,ভুমিসংস্কার, গৃহনির্মাণ, চিকিৎসা, সমাজ কল্যাণ প্রভৃতি নানা বিষয়ের সঙ্গে পঞ্চায়েত প্রত্যক্ষভাবে সংযুক্ত। ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা, ভূমিহীন কৃষকের কর্মসংস্থান কে নিশ্চিন্ত করণ, পশু পালনের ক্ষেত্রে মিনিকিট বিতরণ, ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্প রূপায়ণ, ‘জীবনধারা’ নামে নতুন প্রকল্প চালু করা, বনসৃজন এর তত্ত্বাবধান, বেনামী জমি উদ্ধার করে মিহীনদের মধ্যে বন্টন, পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম প্রভৃতি পঞ্চায়েত দ্বারাই সম্পন্ন হচ্ছে। সমবায় প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে, সমষ্টি উন্নয়ন বিভাগের কাজকর্মে কিংবা সুসংহত গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে পঞ্চায়েতের আছে প্রত্যক্ষ ভূমিকা।

উপসংহার

রাজনৈতিক সচেতনতা গণতান্ত্রিক সাফল্যের চাবিকাঠি। গণতান্ত্রিক বোধ ও রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধির প্রশস্ত ক্ষেত্র হলো পঞ্চায়েত ব্যবস্থা। গ্রামীণ মানুষের সুখ স্বাচ্ছন্দ, আশা-আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ হওয়া, আর্থিক উন্নয়ন ও সামাজিক কল্যাণ সাধনের স্বর্ণদ্বার খুলে দিয়েছে পঞ্চায়েত সংস্থা। প্রমাণিত হয়েছে জনকল্যাণমুখী সদিচ্ছা ও ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়াকে যথার্থ প্রয়োগ শীল করতে পারলে জনগণের সতঃস্ফুর্ত উৎসাহ, উদ্দীপনা ও সহযোগিতায় গ্রাম উন্নয়নের কঠিন অনুর্বর মাটি ও হয়ে ওঠে স্বর্ণপ্রসু।

Related Posts
Scroll to Top